উক্তি
১. জীবনের কাছে হয়তো 'সত্য' বলে কিছু নেই। মানুষের জানার ও বোঝার আগ্রহের মধ্য দিয়েই চিন্তাজগতে 'সত্য' বলে একটা জিনিস তৈরি হয়েছে, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটা পরিবর্তনশীল। মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতার মধ্য দিয়েই মনোজগতে প্রকৃতির থেকে বিভাজন বোধের আবির্ভাব ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে একটা নতুন ভয়েরও সৃষ্টি হয়। এই ভয়ের হাত থেকে রেহাই পাবার যাবতীয় প্রচেষ্টার পরিণতি হল আরো জটিল চিন্তা। চিন্তার মধ্য দিয়েই মানুষের মনের মধ্যে আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারনার জন্ম হয়, তার নাম হল সময়। চিন্তালব্ধ উপসংহার পরিবর্তনশীল এবং অনিত্য। আজ যা মানুষের কাছে পরম সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে তা অতীতের বা বর্তমানের কোনও একজনের বা সমষ্টিগত চিন্তার মাধ্যমে আবির্ভূত হয়েছে। পরবর্তীকালে তা সত্য বলে নির্ধারিত হবে কি না তা কেউই বলতে পারে না।
২. সমস্ত ধর্মীয় আশাসমূহ যা মহৎ জীবনের অঙ্গীকার করে বা উন্নত আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছনোর কথা বলে, এ সবই হল কল্পকাহিনি শ্রেণিভুক্ত, এদের কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। কল্পনার জগতে “আশা” সর্বদাই ক্রিয়া করে চলে। অহম বেঁচে থাকে কল্পনার জগতে আশার মাধ্যমে ।
৩. চিন্তা এবং প্রতিচ্ছবি নির্মাণের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক বিচ্ছিন্ন সমান্তরাল অস্তিত্বের। এই দুটি অর্থাৎ চিন্তা এবং মানসিক প্রতিচ্ছবি এমন একটি জগৎ সৃষ্টি করেছে যা জীবনের সঙ্গে সংযোগকারী উদ্দীপনা ও সাড়া ব্যতিরেকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে। তুমি এখানে বসে একটা বই পড়তে পার এবং কল্পনায় সৃষ্টি করতে পার যেন তুমি সেখানেই আছ। জীবনের বিস্তারে, বাস্তবে, তার কোনও অস্তিত্বই নেই – কিন্তু যেভাবেই হোক তুমি সেই চিন্তায় এবং প্রতিচ্ছবি নির্মাণে সাড়া দিচ্ছ। তোমার বিরামহীন সাড়া সৃষ্টি করেছে আরও আরও প্রতিস্পন্দনের চাহিদা। এখন যেটা হচ্ছে সেটা হল যে, তোমার মধ্যে এরূপ প্রতিস্পন্দনের চাহিদা প্রয়োজনের তুলনায় অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। তোমার চিন্তার জগৎ, যা কিনা তোমার কল্পনার জগৎ-এর এক সৃষ্টি, যদি তা কোনওক্রমে কোনও কিছুকে সমর্থন না করে, তাহলে এই চাহিদা বৃদ্ধি লাভ করতে পারে না এবং ধীরে ধীরে থেমে যেতে শুরু করে।
৪. মঙ্গল বা কল্যাণের সমর্থনে আর কি থাকতে পারে যা চিন্তাসমূহ এবং প্রতিচ্ছবিসমূহের জগতে নেই? চিন্তার সমর্থন ব্যতীত এমন কোন কল্যাণ বা মঙ্গল সেখানে আছে কি? চিন্তার পরিণাম হল কেবল শব্দ, ঠিক? শরীর এ সমস্ত জিনিসকে পাত্তা দেয় না। সে শুধু ফিরে পেতে চায় চাপ (উৎকণ্ঠা) হীন পরিস্থিতি বা অবস্থা - যতদূর সেটা সম্ভব। চিন্তালব্ধ কোনও সমর্থনকে শরীর পাত্তা দেয় না। দৈবাৎ যদি উদ্বিগ্ন চিন্তা দ্বারা মীমাংসার বিফলতা তোমার কাছে প্রত্যক্ষ হয় তা হলে হঠাৎ তোমার শক্তি যা নাকি ক্রমাগত নিরবিচ্ছন্নভাবে অপব্যায়িত হচ্ছিল তা আর অধিককাল অপব্যায়িত হতে পারবে না। একটা ভিন্ন প্রক্রিয়া উন্মোচিত হতে শুরু করবে। তোমার শরীরের আভ্যন্তরীণ বিন্যাসে আমূল এক মহা পরিবর্তন সূচিত হবে। ওই স্তরে তোমার মানসিক চাপ বা উৎকণ্ঠা খুবই কমে আসবে এবং পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী এর সুবিন্যাসকে প্রতিষ্ঠা করে এর যাত্রাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে শরীর কাজ করতে শুরু করবে। এক নির্দিষ্ট অবস্থায় যা অজ্ঞাত, দেহের ভারসাম্য এবং বিকাশ সুবিন্যাসের আওতায় এসে পড়বে, অবিন্যাস আর মাথাচাড়া দিতে পারবে না, দেহ তার মঙ্গল এবং শান্তিময় সহাবস্থানের জন্য শক্তিময় ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করবে। এর সংকেত হল শরীরের গ্রন্থিসমূহের ক্রিয়াকর্মের সুসংহত পরিবর্তন এবং সমস্ত ব্যাপারই এক আলাদা বিন্যাসে কাজ করতে শুরু করা। চিন্তাপ্রসূত তার্কিক সমর্থনের এর আর কোনও প্রয়োজন থাকবে না।
৫. জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এতই সীমিত যে আমরা সেই জ্ঞানের উপযোগে ভবিষ্যত কোনওদিন জানতে পারব না। মানুষের ভয় ব্যাপারটাই এসব জড়িয়ে। আমরা ভবিষ্যৎ জানতে চাই, কারণ আমরা কাল্পনিক ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারি বলে। আমাদের অজানা ভবিষ্যৎ যে ভয়ের সৃষ্টি করে, তার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য আমরা এক অসাধারণ চাহিদার সৃষ্টি করেছি। এই চাহিদা থেকেই ধর্মযাজক, রাজনৈতিক নেতা, জ্যোতিষী, সাইক্রিয়াটিস্ট এবং ভগবানের সৃষ্টি। মানুষের জ্ঞান কোনওদিন এ সমস্যার মুলে পৌঁছতে পারবে না।
৬. আমরা কোনও জিনিস উপলব্ধি করতে পারি তখনই যখন আমরা জ্ঞানের উপযোগ করি। আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি এই জ্ঞান সরবরাহ করে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে কিছু নেই - আমাদের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি ভাবনা অন্য কারোর কাছ থেকে জ্ঞানত বা অজান্তে, প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে শেখা, তাই নিজের বলে কিছু মনে করাটা হল নিজেকে ঠকিয়ে বাহবা নেওয়া।
৭. যে মুহূর্তে তুমি কোনও কিছুকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কর - ধর, একটি চিন্তা - তুমি ওটার চর্যা করছ মানে, তাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় ওই চিন্তার জন্য শক্তি প্রয়োগ করছ। যে বিশেষ চিন্তা থেকে মুক্ত হতে চাইছ, তাকেই তুমি সঞ্জীবনী শক্তি প্রদান করছ। এর সঙ্গে মোকাবিলা করার একটাই পথ আর তা হল তোমার সত্তার উপর এর পূর্ণ-প্রতিক্রিয়া ঘটানো এবং এর গতিবিধি লক্ষ্য করা। হতাশ হও, অবসাদগ্রস্থ হও, বিষণ্ণ হও, তোমার শরীর এসব নিয়ন্ত্রণ করবে।
৮. তোমার চিন্তাশীল মন বর্তমান কালে থাকতে পারে না - যে মুহূর্তে তুমি স্বীকার কর যে তুমি বর্তমানে আছ, তোমার স্বীকৃতিই তোমায় বর্তমান থেকে বিচ্যুত করে। বিদ্যমান জগতে থাকাকালীন জ্ঞানের উপযোগ না করলে তোমার আমিত্বের অস্তিত্ব থাকে না। নিরবচ্ছিন্নভাবে অতীতে প্রবেশ করা এবং সেই অতীত থেকে, যে ভবিষ্যতের কোনও বাস্তব অস্তিত্বই নেই সেই ভবিষ্যতকে নির্মাণ করা - এটাই মনের প্রকৃতি। পুনরুদ্ধারযোগ্য স্মৃতিভাণ্ডার যাকে বলি ‘জ্ঞান’ তা ‘পছন্দ’ বলে এক প্রক্রিয়ায় অস্তিত্বহীন ভবিষ্যৎকে চেতনায় প্রক্ষেপিত করে, ‘ইচ্ছা’ বলে এক সত্যকে ব্যবহার করার মাধ্যমে । মনের এই ক্রিয়াকর্মের মূলভিভ্তিকে আমরা বলি ‘আশা’ । এই প্রক্রিয়ার নিরবচ্ছিন্নতায় মন আশাবাদী হয়ে সাময়িকভাবে চাপ বা উদ্বেগরহিত হবার প্রয়াস করে।
৯. আমাদের দেহের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত নালীবিহীন গ্রন্থিপুঞ্জ (ductless glands) পরস্পরের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ বজায় রাখে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক ঠিক নিউরনপুঞ্জে সঠিক মাত্রায় বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ জারি রাখে। আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে কি সম্বন্ধ হবে তা গভীরভাবে এইসব নিঃসরণের উপর নির্ভর করে। তাই এসব রাসায়নিক ভারসাম্যের উপর সরাসরি নির্ভর করে আমাদের মনের অবস্থা অর্থাৎ মানসিক সন্তোলন।
১০. সংস্কৃতি কথাটার মানে হল ভেজাল - আমাদের এই বিবর্তিত দেহ নিপুণ যোগ্যতা ও অসাধারণ বুদ্ধি নিয়ে প্রকৃতিতে বিরাজ করছে। এর চাহিদা অত্যন্ত সীমিত, প্রকৃতপক্ষে অসীম শান্তির আধার এবং অতি নিরীহ। যখনই ওই ভেজাল আমাদের মধ্যে যুক্ত হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে এক ভয়ার্ত, হিংস্র, অস্থির, লোলুপ উটকো জিনিসে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর এসব ঢেকে রাখার জন্য প্রেম, ভালোবাসা প্রভৃতি জিনিসের আবিষ্কার করা হয়। কোটি কোটি বছর ধরে তিলে তিলে এক অসাধারণ অতিসংবেদনশীল স্নায়ুবিন্যাসের উপযোগে প্রকৃতি এই গভীর শান্তিময় নিরীহ দেহটাকে
বিবর্তনের এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সেই চরম অনুভূতিশীল দেহের অদ্ভূত ক্ষমতাকে সুখ ভোগের সামগ্রী করেছে এই ভেজাল । আর সুখ ভোগের শীর্ষে রাখা হয়েছে “সমাধি' আর “সচ্চিদানন্দ'কে।
১১. আশাহীন কোনও কিছুকে প্রহণ না করার ব্যাপারে আমরা গভীরভাবে প্রভাবিত, নিয়ন্ত্রিত এবং অভ্যস্ত। এটাই আমাদের ভাবনাকে ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে এবং চিরস্থায়িত্ব প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে। চিন্তার গতিবিধি এক বিশেষ যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রলম্বিত হয় এবং চিন্তার জগৎ নিরবিচ্ছন্নভাবে আমাদের উদ্যোগের পর উদ্যোগ সৃষ্টি করতে বাধ্য করে।
১২. একটা নির্দিষ্ট আচরণবিধি যা সমাজ আরোপিত করেছে এবং যদি তুমি তা মেনে না চল, তবে তার পরিণামসমূহের মুখোমুখি তোমাকে হতেই হবে। ভালো - মন্দ জাতীয় অসংখ্য দ্বন্দ্ব তোমার মধ্যে থাকবে - তুমি বিদ্রোহী হতে পার, কিন্তু তুমি ফিরে আসতে প্ররোচিত হবে এবং সামাজিক প্রভাব তোমার মধ্যে কাজ করতে থাকবে - তুমি কত কাল ধরে বিদ্রোহ করবে সেটা কোনও ব্যাপার নয়। এই সমস্ত ব্যাপারের মোকাবিলা এবং নিষ্পত্তি তোমার নিজেকেই করতে হবে। এই ব্যাপারে অন্য কেউ তোমাকে শেষ পর্যন্ত সাহায্য করতে পারে না। মনুষ্যপ্রকৃতি সম্বন্ধে যদি তোমার কিছু জ্ঞান থাকে, তুমি কখনও কোনওদিন অপর কাউকে সে পথে ঠেলে দিতে চেষ্টা করবে না, যে পথে চলাটা তুমি ভাবছ সঠিক।
১৩. এমন একটা পরিবেশ থাকা সম্ভব যার প্রভাব আমাদের মধ্যে জীববিজ্ঞানভিত্তিক সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি করার অনুকূল, এমন একটা প্রকৃতি নির্ধারিত ক্ষেত্র - প্রবল শক্তিশালী ক্ষেত্র, যার দৃঢ় আভ্যন্তরীণ আন্দোলন অন্যান্য জীবের উপর মঙ্গলময় প্রভাব আনতে পারে। এটা সম্ভবপর হয় প্রাথমিকভাবে আমাদের শরীরে অনালগ্রন্থিগুলিকে যথাযথভাবে কাজ করতে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে। যে চালিকাশক্তি আমাদের সাহায্য করে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার, তার উৎস হল দেহের বিভিন্ন হরমোন এবং নিউরোট্রান্সমিটারের ঠিক ঠিক পরিমাণের উপস্থিতি এবং নিঃসরণ । এটাই হল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। দেহ সবসময় এই সহাবস্থানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমাদের পরম শান্তির প্রবণতা হয়তো দেহের এই সুপ্ত ইচ্ছারই একটা প্রতিফলন। কিন্তু মনের গতিবিধি আমাদের এই অবস্থা থেকে সবসময় দূরে সরে থাকতে বাধ্য করে। মনস্কামনা এমনই একটা জিনিস - এমনকী সুখশান্তিতে থাকার মানসিক চাহিদাও এই ভারসাম্য থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ দেহ তার ইন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে মনের অজ্ঞাতে সামগ্রিকভাবে এই অবস্থায় যাওয়ার জন্য ব্যাকুল।
১৪. সমাজ আমাদের যে অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে এর থেকে বেরিয়ে আসার কোনও পথ নেই। প্রকৃতপক্ষে আমরা কী চাই? এমন কোনও চাহিদা আছে কি যা আমি আমার মৌলিক চাহিদা বলে মনে করতে পারি? এমনকী ঈশ্বর লাভের চাহিদাও সমাজ আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। সমাজ যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন বিষয়ের উপর নানা রকম প্রতিকৃতি সৃষ্টি করেছে, আর আমাদের বাধ্য করেছে সেইসব বীরদের পূজা করতে। মহাপুরুষ, বীরদের পুজা করে তাঁদের মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর দুঃখ ও হতাশার। অন্যের মতো হওয়া মরীচিকার পেছনে ছোটার মতন, যার কোনও অস্তিত্ব নেই, কাল্পনিক কুহেলিকা মাত্র, তাকে বাস্তবায়িত করার বিফল প্রয়াসের মতন।
১৫. আশার কখনও মৃত্যু হয় না। তুমি এখনও আশা কর যে তোমার নিজস্ব কোনও জ্ঞান বা প্রচেষ্টা অথবা অপর কোনও ব্যক্তির প্রজ্ঞাযুক্ত উপদেশ তোমাকে এই অস্বস্তি বা অস্বাচ্ছন্দ্য থেকে বার করে আনবে। আমায় বিশ্বাস কর - এটা হবার নয়।
১৬. তুমি যা করতে চাও, প্রকৃতপক্ষে তোমার পারিপার্শ্বিক প্রভাব তোমাকে যা কিছু ভাল-মন্দ বলে শনাক্ত করে বোঝাতে বাধ্য করেছে শুধু তাই। এটা একটা সামাজিক প্রভাব এবং তোমার সারাজীবন ব্যয় হয়েছে ক্রমাগত এটা অনুসন্ধান করতে যে তোমার নির্দ্বিধায় কী করণীয় ছিল - এ এক কখনই শেষ না হওয়া কর্মসূচি। প্রকৃতপক্ষে “তুমি” এসব সমস্যাকে বাঁচিয়ে রাখার মূল। তুমি কিছুতেই বুঝতে পার না যে তোমার চিন্তা কখনই এসব জিনিস সমাধান করতে পারে না।তবু তুমি সবসময় তোমার চিন্তার যান্ত্রিক ক্রিয়াফলকে ব্যবহার করে চলেছ। তুমি বুঝতে চাও - তুমি তোমার সমস্যার সমাধান করতে চাও, কিন্তু তোমার চিন্তা তোমাকে সমাধান দেবে না এবং এর (চিন্তার) তাৎক্ষণিক কৃতকার্যতা হল “আশা,। এই সব ধারণার সঙ্গে চিন্তা এবং চিন্তক সবসময় সংযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এর থেকে যা কিছু সৃষ্টি হবে তা হল সামাজিক প্রভাব, এর বাইরে কিছু নেই। এর থেকে বের হওয়ার কোনও পথ নেই, যদি দৈবক্রমে এ জ্ঞান বোধে বোধ হয় তখন তুমি আর কাউকে জিজ্ঞাসা করবে না “আমি কী করব? এবং কাউকে উপদেশ দেবে না তার কী করণীয়।
১৭. প্রকৃতি পরিকল্পিত সামঞ্জস্য যদি দৈববশে কোনও ব্যক্তির দেহের অভ্যন্তরে স্থাপিত হয়, অর্থাৎ বিভিন্ন গ্রন্থিপুঞ্জ ঠিকঠাক যেভাবে যে বয়সে ক্রিয়াশীল হওয়ার কথা সেভাবে কর্মক্ষম হয়ে ওঠে তাহলে সেই দেহে এক আমুল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বাহ্যিক ক্রিয়াকলাপে মনে হবে সেই ব্যক্তির জীবনে যেন কোনও অভিনব সত্তার অবতরণ হয়েছে, যার প্রত্যক্ষ ফল হল সেই ব্যক্তির মধ্যে অসাধারণ শক্তিশালী ক্ষেত্রের আবির্ভাব ঘটা।
১৮ . আমাদের সবার মধ্যে একটা দেহভিত্তিক চাহিদা আছে, সম্পূর্ণ বিকাশের চাহিদা। একটা গভীর স্রোত বাধাহীনভাবে বয়ে চলার প্রয়াস করছে, আর সামাজিক মূল্যবোধের কাঠামো তাকে ক্রমাগত রুখে দেওয়ার প্রয়াস করছে। এই বাধাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা, এই দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হওয়ার চাহিদার প্রকাশ - গভীর হতাশা ।এর উৎস আমরা বুঝতে পারি না, বুঝতে চাই না - আমাদের শুধু মনে হয় ইচ্ছাপুরণ করতে না পারার জন্যই আমাদের এ অবস্থা অর্থাৎ হতাশার জন্ম। আমরা একে এড়িয়ে চলার জন্য নিত্যনতুন কর্মকাণ্ড আবিষ্কার করে চলেছি, অথচ এই সমস্ত কর্মপ্রয়াস সামাজিক মূল্যবোধেরই নবতম সংস্করণ।
১৯ . যখন তুমি কোনও বিষয়ে চিন্তা করতে থাক, তখন ব্যাপারটা সহজ হয় যদি বহু লোকের মেনে নেওয়া ধারণার সঙ্গে তোমার ধারণার সামঞ্জস্য থাকে। যদি দুই ধারণার মধ্যে গভীর দ্বন্দ্ব থাকে এবং তোমার পক্ষে ব্যাপারটা মেনে নেওয়া অসম্ভব হয়, তখন কী হয়? এই মতানৈক্য দ্বন্দ্বের কারণ অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজন প্রভূত শক্তি, সাহস এবং ন্যায় ও সততায় প্রবল নিষ্ঠা। সেটাই গভীর কার্যকরী এবং জ্বলন্ত বিবেকবোধ লাভের একমাত্র পথ।
২০. এই জগৎটা হল ঠিক এখন যে রকম দেখছ ঠিক সেইরকম - এটাই সব। যা-ই কিছু আমরা করি না কেন সবই হল এই জাতীয় ক্রিয়াকর্মের বিস্তার বিশেষ। এমন কোনও স্তর বা রাজ্য এর বাইরে নেই - এমন কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই যা নাকি এর অধিক কিছু। যে অতীত তোমার পশ্চাতে পড়ে আছে সেটা ঠিক এরকমই কিছু মাত্র ছিল, অন্যকিছু নয় - বাকি সব মিথ্যা কল্পনা। সেই কাল্পনিক স্তরের ব্যাপারে যখনই তুমি আনন্দ অনুভব কর তোমার অস্তিত্ব বর্তমান থেকে চ্যুত হয়, সেটাই মায়া। আমি কি বলছি সেটা বোঝার চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে আমার বাক্যপ্রবাহকে তুমি তোমার মধ্যে ছিন্ন কর এবং মায়ার জগতে প্রবেশ কর। কারণ তোমার কল্পনার জগৎ তোমার জীবনের সঙ্গে এইভাবেই সংযুক্ত হয়ে আছে। সেটাই হল সমস্যা।
২১. আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ইন্দ্রিয় যখন ভারসাম্যপূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনের প্রকাশ দেখতে পায় বা তার সন্ধান খুঁজে পায় তখন আমাদের অভ্যন্তরে সংবেদন জেগে ওঠে। মুশকিল হল এই সংবেদন চেতন মনে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া জাগাবে সে ব্যাপারে আমরা একেবারেই অজ্ঞ। আমাদের চেতনা আমাদের দেহের এক অতি সীমিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়, তাই আমাদের মধ্যে এমন অনেককিছু ঘটা সম্ভব চেতন মন যার কোনও হদিশ খুঁজে পায় না। অবশ্য এসব সংবেদনের পরবর্তী আঘাত এবং প্রত্যাঘাত চেতনার স্তরে উঠে এলেও আসতে পারে। চেতন স্তরে উঠে না এলেও তার মানে এই নয় যে আমাদের মধ্যে কোনও সংবেদন জাগেনি।
২২. মহাপুরুষ, মহামায়া বা পরম চালক - জীবনের নিগূঢ় একটা প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করার জন্য কাল্পনিক এক কাঠামো মাত্র। সেই নিগূঢ় প্রক্রিয়া যা আমাদের মধ্যে প্রাকৃতিক সামঞ্জস্য আনতে সাহায্য করতে পারে। যা এমন এক ভারসাম্য বজায় রাখবে যার প্রবল আরোপ আমাদের মধ্যে আর কোনওদিন বাসনার কাল্পনিক পাখনার সহযোগে মায়ার জগৎ সৃষ্টি করতে পারবে না। সে প্রক্রিয়ার বীজ আমাদের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে। সুপ্তি ভাঙানো - মুমুক্ষা দেহেরই চাহিদা।
২৩. কোনও মানবীয় ধারণাই জীবনকে হুবহু অনুসরণ করতে পারে না। জীবন সম্বন্ধে কোনও বোঝাপড়াই জীবনের মিথোজীবিত্বের সঙ্গে (Symbiosis) মেলবন্ধন ঘটাতে অপারগ। যে জীবন নিজেকে সৃষ্টি করেছে এবং তার ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে আমাদের পক্ষে তাকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা অসম্ভব। নিজেকে রক্ষা করার এক সাধারণ উপজাত বস্তু হল আমাদের সীমাবদ্ধ বুদ্ধি - সেটাই হল মস্ত সমস্যা। আমরা সর্বদাই জীবনচক্রের একটা অংশ বুঝতে পারব, সমগ্রকে ধারণা করা অসম্ভব।
২৪. আমরা জানি যে দেহের বিভিন্ন অংশের কাজকর্মের ফলাফল বিভিন্ন লোকের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি জাগায়। এই অনুভূতি যখন অতীত জ্ঞানের মাধ্যমে চেতনার জগতে অনুবাদ করার চেষ্টা করে, তখন স্মৃতি যে প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছিল এবং যে সমস্ত উপকরণ ও বাহ্যিক সংঘাতের ফলে সেই স্মৃতিসম্ভার গঠিত তার উপর নির্ভর করে অনুবাদের রূপটি কী হবে। যেহেতু প্রতিটি জীবনে স্মৃতিসম্ভার এবং বাহ্যিক সংঘাতের রাস্তা অত্যন্ত ভিন্ন, সেহেতু একই ধরনের সংবেদনের অত্যন্ত ভিন্ন ধরনের বহিঃপ্রকাশ হওয়াটা স্বাভাবিক। বহিঃপ্রকাশ যাই হোক না কেন, এক উন্নত স্তরের সাংগঠনিক অস্তিত্বের প্রভাব-প্রকৃতির গভীর পরিকল্পনাজাত সংগঠনের আরোপে যে তেজ ও বীর্যের সৃষ্টি হয় তা অন্য সমস্ত জীবের উপর সার্বভৌম মঙ্গলময় প্রভাব বিস্তার করবার জন্যই জন্মগ্রহণ করে ।
২৫. জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবকোষে যেমন এই সংবাদ মজুদ থাকে যে প্রথম বিভাজনের বারো - চোদ্দো বছর পরে নতুন রসধারার নিঃসরণে দেহ-মনে ঝড় আসবে, অভিসারের সরঞ্জাম আপনা - আপনি তৈরি হবে - ঠিক সে রকম আর এক মহামিলনের প্রকাশ - মুমুক্ষা, যা দেহের গভীর অভ্যন্তরে ঘটাবে বৈপ্লবিক রূপান্তর - মহামিলনের উত্তেজনায় সৃষ্টি হয় তাপস - অসাধারণ তাপস। এই তাপসের জন্ম থেকে মহাযোগের পূর্বমুহূর্তের ব্যাপ্তির নামই তপস্যা। যে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আভ্যন্তরীণ তাপকে সমস্ত কামনা, বাসনা এবং ভীতি উপেক্ষা করে কাজে লাগাতে পারে সেই সার্থক তপস্বী।
২৬. মনুষ্য জাতিকে সঠিক পথে রাখার জন্য তুমি কি কোনও যুদ্ধ চালাতে যাচ্ছ? সঠিক পথটি কী? তুমি কি জান সেই পথ যা কার্যকরী হয়েছে ? প্রকৃতপক্ষে সর্বজনবিদিত কোনও পথ নেই। কোনও যুক্তি সেখানে কাজ করে না- একটাও না। তুমি কোনও ব্যবস্থার স্বপক্ষে যেতে পার না, যতক্ষণ না তুমি তোমার মগজ ধোলাই করে এটা বিশ্বাস করতে শুরু করছ যে একটা বিশেষ ব্যবস্থাই সঠিক সমাজব্যবস্থা এবং সেখানে যাওয়ার একটা পথই সঠিক পথ। যদি এবং যখন তুমি এটা কর, তুমি নানা পথের সৃষ্টিকারী ঠিক সেই প্রাচীন রক্ষাকর্তাসমূহে পরিণত হও যাদের কোনও পথই তোমার জীবনে কার্যকরী হয় না। যদি তা না হত, তবে তুমি এটা পাঠ করতে না।
২৭. সামাজিক শক্তির বহুকালব্যাপী প্রভাব মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছে এক প্রবল ভরবেগের - এই স্থিতাবস্থার প্রয়োজনে মানুষের মনে যেমন জন্ম হয় গভীর দুঃখ এবং দুর্দশা, ঠিক এই প্রয়োজনেই আবার জন্ম হয় অসাধারণ গর্ববোধ । এই তিরস্কার এবং পুরস্কারের মাধ্যমে সমাজ তোমাকে ব্যবহার করতে চায় - সে যা চায় তা তোমার মাধ্যমে পেতে চায়। ইউজীর ভাষায় - “তোমার মধ্যে তাদের চাহিদা অনুযায়ী চাহিদার সৃষ্টি করে এবং তোমার মাধ্যমে তোমার সহযোগে তা আদায় করে।
২৮. দেহের আভ্যন্তরীণ পরিবর্তনে যদি মানসিক সত্তার পরিবর্তন ঘটে তাহলে মনকে চিরতরে পরিবর্তিত করার একমাত্র পথ হল দেহের মধ্যে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটানো এবং এই রূপান্তর হয়তো মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক সত্তার জাগরণ ঘটাতে পারে। মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক সত্তার জাগরণে মানুষের মন প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে উন্মুখ হয় এবং দেহের পরিবর্তনে মনের যখন সেই ভাব হয় তখন দেহ-মন ক্রমাগত এমন স্তরে আসতে চায় যেন দেহে আধ্যাত্মিক সত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারে। আধ্যাত্মিক সত্তার পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমেই হয়তো প্রকৃতির সঙ্গে নিয়ত ভারসাম্য বজায় রাখার যে প্রয়োজনে মানুষের সৃষ্টি হয়েছিল, মানুষ সেই প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী প্রকৃতির অদৃশ্য আদেশকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পালন করতে পারে।
২৯. আমরা কি দেখতে বা বুঝতে পারব তা নির্ভর করে আমাদের পশ্চাৎপট এবং অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধির উপর। অপরে যা কিছু বলে তা যদি পুরোপুরি সত্য বলে মেনে নেওয়া হয় তা হলে নিজেকে প্রতারিত করা হয়। নিজের বিবেকের জ্বলন্ত আগুনের মধ্য দিয়ে সবকিছু পরীক্ষা করে দেখার পরই দৃঢ় এবং শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হয় - এরপর অন্যের চাটুকারিতার উপর আর নির্ভরশীল হতে হয় না।
৩০. কোনও নির্দিষ্ট একটা ইন্দ্রীয়জনিত কার্যফলে যে ব্যবহার আমাদের মধ্য থেকে স্বতোৎসারিত হয় তার গুণাগুন (ভালো- মন্দ) বিচার করার প্রয়োজন নেই এবং এর উৎসের কার্যকারিতার সন্ধানেরও প্রয়োজন নেই। কারণ সে সন্ধান থেকে যে জ্ঞান উৎসারিত হবে তার সঙ্গে যে ব্যবহার আমাদের মধ্যে স্বতোৎসারিত হয় তার কোনও যোগাযোগ নেই। সূর্যকে উত্তপ্ত রাখতে কী জাতীয় পারমাণবিক বিক্রিয়া সেখানে হচ্ছে তা জানার সঙ্গে যেমন জীবনের সঙ্গে সূর্যালোকের মহত্বের কোনও সম্পর্ক নেই, ঠিক সেই রকম মস্তিষ্কের নিউরনের অস্তিত্বকে অবলোকন করার সঙ্গে আমাদের বিশ্বজগতের কোনও সম্বন্ধ নেই।
৩১. যখন কেউ জীবনকে অবলোকন করে এবং তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করে, তখন সে একথা ভাবতেও পারে না যে তার ক্ষমতা কেবলমাত্র খুব সীমাবদ্ধ এবং নির্দিষ্টই নয় উপরন্তু নিজেকে (প্রক্রিয়ায়) অন্তর্ভূক্ত না করে খুব সামান্য অংশই সে অবলোকন করতে পারে। অবলোকনপ্রাপ্ত ফলাফলের থেকে এই অবলোকন - প্রক্রিয়া সর্বদা গোপন (প্রচ্ছন্ন) থাকে। নিজেকে কেউ কখনও প্রত্যক্ষ অবলোকন করতে পারে না। তার অন্তর্নিহিত ধারণাসমূহ সেই সমস্ত জিনিসকে বাদ দেয় যা সে অবলোকন করছে এবং সেই বস্তুসমূহ যা তাকে অবলোকন করাচ্ছে। এটা একটা জটিল যান্ত্রিক ক্রিয়া বিশেষ । এক বিশেষ নির্দিষ্ট কারণে “অহম”এর কাল্পনিক অবস্থান,এর অতিরিক্ত আর কিছু নয়।
৩২. আমাদের অজান্তেই আমাদের মধ্যে একটা অপরিসীম শক্তি বিশ্বস্তভাবে কাজ করে চলেছে। প্রতিটি মানুষের জীবনই এই বিশাল শক্তির লীলাভূমি। আমরা আমাদের দৈনন্দিন সমস্যার কবলে এমন ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকি যে এই পরম গতিময়তা কখনও আমাদের অনুভূতিতে পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে না। আসলে একটা জীবের বেঁচে থাকতে হলে যে অসীম ক্ষমতার প্রয়োজন সেটা মৃত্যুমুখে পতিত হবার অনন্ত সম্ভাবনার দিকে নজর দিলেই হয়তো বোঝা যায়। শুধু এক জীবনের নয়, আমাদের দেহটা কোটি কোটি বছরের জীবের এই বেঁচে থাকার সংগ্রামের বিজয়বার্তা বহন করে চলেছে এবং এই সত্য প্রতিটি জীবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
৩৩ . সেটাই হল প্রকৃত জ্ঞান যা জীবনকে সম্মান করে, এবং মর্যাদা দেয় নিজের জীবনকে এবং ঠিক সেইভাবেই অপরের জীবনকে। এই সারমর্ম যদি মনুষ্যজীবনকে পরিশুদ্ধ করতে শুরু করে তবে সেটাই একমাত্র আশার কথা, আর কিছুই নয়।
৩৪ . বেদান্ত বলে জগত মায়া, শুধু ব্রহ্ম সত্য - এই সমস্ত ধারণা মানুষের চিন্তার পরিণতি, চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল একক থেকে বিভাজনের প্রক্রিয়ার দ্বারা। অখন্ডে চিন্তা লীন, কোনও প্রকাশ থাকে না। শব্দ যেমন মাধ্যম ছাড়া বিকাশহীন, সে রকম চিন্তাও মানুষের মন ছাড়া প্রকাশ পায় না। শব্দের মতনই চিন্তার মধ্যেও মাধ্যমের গুণ ও প্রকৃতি জড়িয়ে থাকে। বিশুদ্ধ চিন্তা বলে কিছু নেই। মানবজাতির সমস্ত জ্ঞান চিন্তালব্ধ - ব্যক্তিগত ভাবনা ছাড়া কোনও জ্ঞান রূপ ধারণ এবং বিকাশ লাভ করতে পারে না।
৩৫ . প্রতিটি চিন্তার একটি বস্তুতান্ত্রিক উৎসমূল আছে - এমনকি যাকে তুমি আধ্যাত্মিক ধারণা বলে বিবেচনা কর তাতে তোমার বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বস্তর প্রয়োজন। অর্থাৎ চিন্তা এক বস্তুগত প্রক্রিয়া।
৩৬ . শিক্ষণ, বোধগম্যতা, দৃঢ়চিত্ততা, আত্মজ্ঞান, মুক্তি ইত্যাদি সমস্ত ধারণা চিন্তার জগতে বিভিন্ন আবেগময় ক্রিয়াকর্ম সংগঠিত করে এবং ভবিষ্যতের এক আশাপ্রদ চিত্র ও ভাবনার মাধ্যমে সামাজিক প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখে। আরও বিশেষ কিছু অবগত হলে এবং ভালো করে বুঝলে তুমি নিজের জীবনের সমস্যা সমাধান করতে পারবে এবং সেই সুবাদে অন্যের সমস্যারও সমাধান করতে পারবে এই আশার মাধ্যমে 'আমি'র কর্তৃত্ব বজায় থাকে। আরও এক বৃহৎ এবং মহৎ আশা আছে - সম্ভবত তুমি তা অধিগত করবে যার সম্বন্ধে তুমি কিছুই জান না এবং কোনও এক বিশেষ স্তর বা অবস্থা আছে বলে অস্পষ্ট কিছু ধারণার মাধ্যমে - যা নিয়ে মানুষ হাটে – বাজারে বিস্তর আলোচনা করে - দিব্যদর্শন, মোক্ষ, নির্বাণ, পরমাত্মা অবলোকন - এই সবই হল বিক্রয়যোগ্য বিজ্ঞাপনের চমক - আর কিছুই না। এটা সহজেই বিক্রয় হয় কারণ তুমি মনে কর এটা তোমার সমস্ত মুশকিল আসান করবে। এটা হচ্ছে সেই বাজার, যা সৃষ্টি করে ক্রেতা-বিক্রেতা, গুরু-শিষ্য।
৩৭ . আমাদের জাগ্রত চেতনায় যা ধরা পড়ে তার অধিকাংশ কালের স্রোতে অবক্ষয়িত হতে হতে অবনীর গর্ভে অবলুপ্ত হয়ে যায়, আর যেটুকু সুপ্ত থাকে তা কখন, কীভাবে এবং কেন কুহেলিকার মতো আমাদের মনের পর্দায় ভেসে উঠে বিভিন্ন কাহিনির জন্ম দেয় তা কোনওদিন বোধগম্য হবে না। হয়ত চেতনার রহস্য কোনওদিন ভেদ হবে না। আমাদের বিশাল বহির্জগতের এক অতি ক্ষুদ্রাংশ আমাদের চেতনায় কীভাবে উদ্ভাসিত হয় সেটাই অত্যন্ত দুর্বোধ্য, তার উপর মানুষের ক্ষেত্রে যে অংশটা উদ্ভাসিত হয় তার সঙ্গে যেখান থেকে উদ্ভাসিত হয়েছে সেখান থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নতা লাভ করে কালে কালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে ...। বৈজ্ঞানিক যখন তার যন্ত্রপাতি নিয়ে এসব বুঝতে অনেক গভীরে চলে যাবে তখন দেখবে নিউরনপুঞ্জের তড়িৎক্ষেত্রে বহুবিধ বিভিন্ন নকশার আভা। যেন জোনাকিভরা বিশাল অরণ্যে অন্ধকার গভীর রাতে আলোর নকশার মধ্যে কেউ কালিদাসের কুমারসম্ভবের অনুভূতি খুঁজে বেড়াচ্ছে - যারা রহস্যের পীড়ায় জর্জরিত তারা কিছু না কিছু খুঁজে পাবেই। আর যদি ভাগ্যক্রমে কারও আত্মচেতনা চৈতন্য হয়ে যায় তাহলে রহস্যের উপস্থিতি অস্বস্তির জায়গায় আনবে পরম শান্তি।
৩৮ . এই যে দ্বন্দ্ব - একদিকে প্রকৃতির নিয়মে অসাধারণ সামঞ্জস্য, অন্যদিকে সামাজিক নিয়মগুলোর তালগোল-পাকানো এক কিম্ভূতকিমাকার অস্তিত্ব, এই দুইয়ের মধ্যে মানুষ ভারসাম্য আনতে পারছে না। হয়তো আরও কিছু জানলে বা আরও কিছু করলে দুঃখ মোচন হবে। বুদ্ধি এবং আশা এমনভাবে মানুষের মধ্যে আরোপ হয়ে আছে যে অক্ষমতার স্থান সেখানে নেই। দু'হাত উপরে ছুঁড়ে দিলে হারিয়ে যাওয়ার ভয়- যতদিন আত্মবোধ,ততদিন প্রশ্ন ও প্রয়াস। মানুষের মধ্যে যে ভুল চালিকাশক্তি ও তার কাল্পনিক অস্তিত্বজাত 'অহম' বিপরীতার্থক নীতির মতন কাজ করে চলেছে তা বোঝা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার মতন। তাই আমরা এসব দেখেও না দেখার ভান করে যে যার ব্যস্ততা নিয়ে বেঁচে থাকি।
৩৯ . সামাজিক প্রভাব সর্বদাই আমাদের মধ্যে ক্রিয়া করে চলেছে। এর প্রতিক্রিয়াকে ভেঙে ফেলা সহজ কাজ নয়। সত্যি কথা বলতে কি - এটা মৃত্যুই। এটা এক আভ্যত্তরীণ প্রক্রিয়া যা তোমার মধ্যে এরকম এক ভীতিজনক অনুভূতি জাগাবে যে তুমি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইবে। কারণ তোমার মনে হবে যে তুমি আর কোনওদিন চোখ খুলবে না।
৪০ . চিন্তার যান্ত্রিক ক্রিয়া সংস্কৃতিকে জন্ম দিয়েছে এবং মানুষের মনকে কুক্ষিগত করে নিয়েছে। এই যান্ত্রিক ক্রিয়া তার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনে এর খেলায় তোমাকে বেঁধে রাখে। যদি তুমি বিদ্রোহ কর (এর বিরুদ্ধে) তবু তুমি এই খেলাতেই অংশগ্রহণ কর। এর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তোমার করার কিছুই নেই। এটা যখন গভীরভাবে তোমার কাছে নিশ্চিতরূপে প্রতীয়মান হবে যে এই ব্যাপারে তুমি কিছুই করতে পার না এবং সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিপাদন সাপেক্ষে এই শরীরের অর্জন বা অধিগত করার কিছু নেই যথা আধ্যাত্মিকতা, ঈশ্বর, প্রেম, ভাগবতকৃপা, ঐশ্বরিক মাধুর্য ইত্যাদি - তখন তুমি অন্যভাবে ক্রিয়া করতে শুরু করবে। বন্ধনের সেই যান্ত্রিক ক্রিয়া যা সংস্কৃতি আমাদের উপর আরোপিত করেছে, এই শরীরের ক্ষেত্রে সে তার পায়ের তলার মাটি হারাবে এবং শরীর সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে আচরণ করবে - এটা নিশ্চিত।
৪১ . নিজের বিবেক দংশন থেকে মুক্ত নয় এমন ধারণা যখন চিন্তার রূপ নিয়ে অন্তরে বাসা বাঁধে, তখন চিত্তক শক্তিশালী হয় - বিবেক দংশন দুটো চিন্তার দ্বন্দ্ব। যেটা জেতে সেটাও “আত্ম” থেকে মুক্ত নয় - আর এমন কোনও চিন্তা নেই যার কোনও বিপরীত নেই - তাই চিন্তা কখনও দ্বন্দ্বমুক্ত নয় । যদি কোনও অভিব্যক্তি স্বতঃস্ফূর্ত হয় - তাহলে তার কোনও পরবর্তী আঘাত নেই - গোলাপের হালকা গন্ধের মতো মাধুর্য দিয়ে হারিয়ে যায়। চিন্তা তার অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে যে চিন্তককে জন্ম দেয় - সেই চিন্তক সবসময় কিছু না কিছু চায় - অপরের উপর জোর করে নিজেকে চাপিয়ে দিয়ে বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করে, মোদ্দা কথা ফ্যাসিবাদী। অথচ স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি, জীবনের অভিব্যক্তি, তার নিজের অস্তিত্বের জন্য যতটুকু শক্তি, সময় এবং স্থানের প্রয়োজন তার বেশী একবিন্দু গ্রহণ করে না। অন্য কোনও কিছুর চাহিদা থাকে না। যে জীবন চিন্তার চাপে বন্দি নয়, প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ততায় ধাবিত, তার ভেতরে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের পর আর কোনও চাহিদা থাকা সম্ভব নয়।
৪২ . জীবনকে বোঝানোর জন্য আমরা যত কিছু বলার চেষ্টা করি জীবন তার থেকে অনেক গভীর এবং ভিন্ন। জীবন একটা জীবন্ত প্রবাহ, আর জ্ঞান স্থির মৃতবৎ - যাদুঘরে সাজিয়ে রাখা মৃত কলেবর।
৪৩ . এই সাধারণ সিদ্ধান্ত যে ঈশ্বর আছে কি নেই, কোনও অভিজ্ঞতাই প্রকৃতপক্ষে আমাদের তা বলতে পারে না। এটা হল একটা ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এ ব্যাপারে তুমি কোনও সিদ্ধান্ত কোনও নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা থেকে লাভ করতে পার কিন্তু তা অবশ্যই সংস্কৃতি থেকে ধার করা। অভিজ্ঞতা তোমাকে কখনোই বলবে না যে বাস্তবে ঈশ্বর আছেন না নেই, কারণ এইজাতীয় অভিজ্ঞতা কখনোই এক কার্যকরী বাস্তব হতে পারে না।
৪৪ . শরীরের সুসংগঠিত ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে তার জীবনীশক্তি এবং সামর্থ্য হল অত্যন্ত গভীর এবং সুদৃঢ়। শরীরের এই সুসংগঠিত ব্যবস্থা যাতে ভেঙে না পড়ে সে কারণে অপরের আগ্রাসন রুখতে শরীর তার অভ্যন্তরে এক যান্ত্রিক ক্রিয়া সংগঠিত করে। এই যান্ত্রিক ক্রিয়া একে ভেঙে ফেলতে দেয় না। যে যান্ত্রিক ক্রিয়া একে ভেঙে ফেলতে দেয় না, আমরা তাকে ভয় বলে অভিহিত করি। যখনই শরীর সংকটাপন্ন হয়, এর ভেতর থেকে এক প্রবল বাধার সৃষ্টি হয়। সেই সকল বাধা নিক্ষেপিত হয় লড়াই (আক্রমণ) বা নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে, একে রক্ষার প্রয়োজনে । সাধারণত যা জানা যায় না তা হল যে ওই একই প্রকার যান্ত্রিক ক্রিয়া আমিত্ববোধ রক্ষার্থেও দেহাভ্যন্তরে শরীরের কাছে সনির্বন্ধ প্রার্থনা করেছিল।
৪৫ . আমাদের চালক - আমাদের কর্মকাণ্ডের কর্ণধার বাহ্যিক প্রভাবে সৃষ্ট চিন্তক ছাড়া আর কিছু নয়। যদিও আমাদের দেহের জীবনশক্তি আমাদের জীবনের মূল চালক - কিন্তু কর্মপ্রচেষ্টার কর্ণধার এই চিন্তক মূল চালককে ক্রীতদাস করে রেখেছে। এই দাসত্ব থেকে ছাড়া পাওয়ার নাম মুক্তি।
৪৬ . যা আমাদের ভাবনাচিন্তা, আগ্রহ, আশা-নিরাশার রাজ্য তৈরি করে তার মূল ইন্ধন হল আমাদের সমাজ এবং সংস্কৃতি। সমাজের চারিদিকে আমরা যা দেখতে পাই তা দেখতে পাই এই কারণে যে তারই একটা অংশ
আমাদের মধ্যে সবসময় কাজ করে চলেছে, অর্থাৎ আমরা হলাম সমাজের আংশিক প্রতিফলন। আমরা এসবের মধ্যে যা চাই না, যেমন মানুষের নিষ্ঠুরতা, হিংসা, লোভ, ক্রোধ ইত্যাদি... দুঃখের বিষয় হল যেহেতু সমাজের ভালোমন্দের দ্বন্দ্ব আমাদের তৈরি করেছে সেহেতু এই সমস্ত কমবেশী আমাদের মধ্যেও পাওয়া যাবে, সোজা কথায় আমরা সবাই সমাজের এই বর্তমান অবস্থার জন্য কোনও একভাবে দায়ী।
৪৭ . আমিত্বের (আত্ম) প্রকৃতি হল আপন প্রয়োজনে সেই স্থান অন্বেষণ করা যেখানে সে নিরাপদ এবং আনন্দময়তাকে অনুভব করবে। এটা একটা পথ, যেখানে “আত্ম” খুব আনন্দময় তা হল আত্মশ্লাঘা বোধ করা। যখন আমি বলি তুমি অত্যন্ত ভালো, এটা সেই পুরস্কার ও তিরস্কারের যান্ত্রিক ক্রিয়াবিশেষ।তুমি পুরস্কৃত হয়েছ এতে তোমার শরীরের একগুচ্ছ রাসায়নিক বিন্যাস পরিবর্তিত হয়, যাকে ভালো-লাগা হিসাবে শনাক্ত কর এবং একই রাসায়নিক সন্নিবেশের জন্য তুমি কল্পনার জগতে নির্বিচারে এর পশ্চাদ্ধাবন কর। তোমার শরীরতন্ত্র সত্যিই এসব মেনে নিতে চায় না, কারণ এটা তার মুলগত ভারসাম্য নষ্ট করে।
৪৮ . দ্বন্দ্ব এবং দুর্দশা নিরসনে জ্ঞানার্জন এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা এবং অনুশীলন মাত্র। জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্য জ্ঞানলাভ অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ সমগ্র মানুষের তৈরী জগৎ সেই অনুযায়ী ক্রিয়া করছে। এটা, একটা জ্ঞানভিত্তিক
সমাজব্যবস্থা, কিন্তু জ্ঞান অর্জনের জন্য যে যন্ত্রকে তুমি ব্যবহার কর এবং এর ব্যবহার পদ্ধতি, একজন ব্যক্তি হিসেবে যে দুর্দশা তুমি ভোগ কর তার কারণ নির্ণয় করতে তোমাকে সাহায্য করে না। তুমি খুঁজে বার করতে চেষ্টা কর – যদি আমি জানি যে কেন আমি দুঃখী, তবে সম্ভবত আমি দুঃখের কারণসমূহ চিহ্নিত করতে পারি - কিন্তু তা নয়। যদি তুমি জান কেন তুমি দুঃখী, তখন তুমি এটা অবগত হও যে এটা তোমার হাতে নেই। ত্যাগ করা মানে - চিন্তার দীর্ঘায়নে ব্যয়িত শক্তির পরিবর্তে তুমি তোমার শরীরতন্ত্রকে একটা সুযোগ দিচ্ছ যথাযথভাবে তার কর্মসম্পাদনে। যদি তোমার ভাগ্য ভালো হয়, শরীরতন্ত্রের যথাযথভাবে কর্মসম্পাদনের মাধ্যমে সম্ভবত শরীর কোনও কিছুকে চিহিত (নির্ণয়) করবে যা তোমাকে সাহায্য করতে পারে।
৪৯ . তুমি এবং তোমার চিন্তা দুটি ভিন্ন বস্তু নয়। তোমার চিন্তা ব্যতীত তোমার কোনও অস্তিত্ব নেই। সেটাই তোমার সর্বঅস্তিত্ব, এর বাইরে তোমার আর কী সত্তা আছে? তোমার শরীর তোমার মহৎ চিন্তাকে কোনও পাত্তাই দেয় না কোনাকড়ি মূল্যও দেয় না)।
