কলকাতার উপকণ্ঠে হুগলী জেলার হিন্দমোটরের প্রথিতযশা লোকপ্রিয় ডাক্তার স্বর্গীয় অজিতরঞ্জন গুহর জ্যেষ্ঠপুত্র সব্যসাচীর জন্ম কলকাতায়, ১৯৫৩ সালের ১লা মে। তাঁর মাতা ছিলেন ধর্মপ্রাণা ভক্তিমতী সুঁলেখা দেবী।
ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণীতে পাঠরত অবস্থায় সব্যসাচীর পড়াশুনায় অমনোযোগ, ঘন ঘন স্কুল পালানোয় উদ্বিগ্ন মাতা পুত্রের মঙ্গল কামনায় পড়াশুনার সাথে সাথে ধর্মীয় এবং আধ্যাত্ম নিগড়ে পুত্রকে গড়ে তুলতে তাকে তাঁর গুরুদেবের পলাশী আশ্রমে স্থানান্তরিত করেন এবং আশ্রমের স্কুলে আশ্রমিক ব্রহ্মচর্য পালন ও বিদ্যালাভের ব্যবস্থা করেন। একঘেয়ে আশ্রমজীবনের গতানুগতিকতার হাত থেকে মুক্তি পেতে সব্যসাচী স্কুলের ছেলেদের নিয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেন ও অল্প দিনেই নিজের দক্ষতায় ভাল খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত হন। এছাড়া এ সময় তিনি নিয়মিত যোগাসন মুদ্রা ও প্রাণায়ামের মাধ্যমে হঠযোগে যথেষ্ট পারদর্শিতা লাভ করেন। দুই বৎসর যাবৎ রোজ সূর্যোদয়ের পূর্বে বালক সব্যসাচীকে একঘণ্টা প্রার্থনা এবং ধ্যান করতে হত। প্রতি সপ্তাহে ভগবৎ গীতার শ্লোক মুখস্থ করে সেসব নিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে আলোচনা করতে হত। সে সময় এ ব্যাপারে তার কৌতুহল এমন বৃদ্ধি পায় যে গরমের ছুটিতে সাইকেল নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের কুঠিতে বসে ধ্যান করতেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য। পরীক্ষার ফল নেতিমূলক হওয়ায় তিনি সেসব বন্ধ করে দেন।
মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী পিতা রাজনৈতিক কারণে কারান্তকালে গেলে দুই বৎসর আশ্রমবাসের পর সব্যসাচী ফিরে আসেন হিন্দমোটরে। এর কিছুদিন পরেই পিতার কারামুক্তি ঘটে এবং তিনি স্ব-পেশায় স্থিত হন। ফুটবল খেলায় সব্যসাচীর দক্ষতা এখানেও তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে আর ভবিষ্যতে বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় হবার বাসনা তাঁর মনকে আচ্ছন্ন করে। প্রতিপক্ষের সমর্থকদের হাতে নির্যাতিত হবার ভয়ে প্রতিপক্ষকে ৫/৬টি গোলের মালা পরিয়ে খেলা শেষ হবার আগেই সব্যসাচীকে মাঠ ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে পালাতে হত। এহেন প্রত্যুৎপন্নমতি প্রতিভাবান খেলোয়াড় যখন পিতার দেওয়া বিবেকানন্দ এবং আইনস্টাইনের বইয়ের মধ্যে আইনস্টাইনের বইটি বেছে নিয়ে খেলার মাঠ পরিত্যাগ করে গৃহকোণে গভীর নিষ্ঠা, মনোযোগ ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে অধ্যয়নে মগ্ন হলেন তখন তার সহপাঠীরা অবশ্যই অবাক হয়েছিলেন-সন্দেহ নেই। স্ব-উদ্যোগে স্বল্পকালেই তিনি পাঠ্যক্রম বহির্ভূত “ক্যালকুলাস” শিখে নেন এবং স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় অত্যন্ত ভাল ফল করে, পিতা-মাতা, আত্মীয়-পরিজনের মুখে হাসি ফুটিয়ে, কলকাতার প্রেসডেন্সি কলেজে প্রি-ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন।
ভারতের বুকে হুনানের বীজ নকশালবাড়িতে সে সময় গর্জে ওঠে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে মেধাবী প্রতিভাবান ছাত্র সব্যসাচী "মেহনতি মানুষের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লড়াই"-এ সামিল হয়ে "গ্রাম দিয়ে শহর ঘের" স্লোগানকে বাস্তবায়িত করতে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরতে থাকেন। অনাহার, অর্ধাহার, আশ্রয়হীন মৃত্যুর মুখোমুখি এক জীবনস্রোতে ভেসে যায় তাঁর যৌবনের অনেকগুলি দিন। বিপ্লব ব্যর্থ হয়। সাম্যবাদের স্বপ্ন ভেঙে যায়-হতাশ, ক্লান্ত, উদ্ভ্রান্ত সব্যসাচী ধর্মপ্রাণা মাতার গুরুদেবের বারাণসীস্থ আশ্রমে আত্মগোপন করেন। এক গভীর রাতে একাকী গঙ্গার ঘাটে বসে থাকাকালীন জলে ভেসে আসা তাঁরই সমবয়সী এক যুবকের মৃতদেহ দেখে বিপ্লব চলাকালীন বারবার মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা স্যবসাচীর অন্তরমধ্যে ধ্বনিত হয় উপনিষদের বাণী-“ত্বমেব বিদিত্বাহেতি মৃত্যুমেতি নান্য পন্থা বিদ্যতে অয়নায়”। আত্মজিজ্ঞাসার এই প্রথম স্ফুরণ তাঁর মনের মধ্যে জ্বালিয়ে দেয় মুক্তির তীব্র পিপাসা। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে চলল পঠন-পাঠন, ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক বইয়ের মধ্যে উত্তর খোঁজা, “কীভাবে তাঁকে বিদিত হওয়া যাবে? মুক্তির কী সেই পথ, পন্থা-প্রকরণ?”
বিপ্লব পরবর্তীকালেরাজনৈতিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এলে সব্যসাচী কলকাতায় ফিরে আসেন ও পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হন। এরপর তিনি রৌরকেল্লার রিজিওনাল ইঞ্জিনীরিং কলেজ (Regional Engineering college) থেকে দুর্দান্ত রেজাল্ট করে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর পাঠ শেষ করেন। স্নাতকোত্তর পাঠের সময় রৌরকেল্লায় থাকাকালীন দক্ষিণী ব্রাহ্মণকন্যা ড. ভামিডিপাটি লক্ষী রাওয়ের সঙ্গে সব্যসাচীর যে প্রণয়পর্ব শুরু হয়েছিল ইতিমধ্যে তা অনাড়ন্বরে শুভ পরিণয়ে পরিণতি লাভ করে। শ্রীমতী লক্ষী রাও ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, মুন্বাই (IIT Bombay) থেকে Ph.D করেন এবং সব্যসাচী ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc) থেকে Ph.D করেন। এরপর শ্রীমতী লক্ষী গুহ কিছুদিন ব্যাঙ্গালোরে সেন্ট যোসেফ কলেজে (St. Joseph College) অধ্যাপনার কাজ করেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে (IISc) গবেষণার কাজে যোগদান করেন। ওই সময় সব্যসাচী ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনে (ISRO) কর্মরত ছিলেন একজন বৈজ্ঞানিক হিসাবে। দু'বছরের মধ্যেই ড. লক্ষী গুহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে রথর্স রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণার কাজে চলে আসেন এবং কয়েক মাসের ব্যবধানে সব্যসাচীও ওই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কাজে যুক্ত হন। এই সময় সব্যসাচী এবং লক্ষী গুহর জীবনের সঙ্গে আরো দুটি জীবন যুক্ত হয়, তাঁদের দুই কন্যারত্ন শিল্পা এবং সুমেধা।
এরপর শুরু হয় সব্যসাচীর জীবনের গবেষণার আর এক অধ্যায়-পরবর্তী বছরগুলিতে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িক পত্রিকাগুলি তে সব্যসাচী ও তাঁর গবেষক দলের পদার্থবিদ্যার উপর গবেষণার কাজ এবং বিষয়বস্তু নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। অশেষ প্রাণশক্তিতে ভরপুর সব্যসাচী জীবনের এই প্রচণ্ড কর্ম-কোলাহলের মধ্যেও জীবনজিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজা থেকে বিরত হননি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের প্রভাব এবং পরবর্তীকালে জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তির প্রভাব তার মধ্যে আত্মজ্ঞানলাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষার বাতিটি জ্বালিয়ে রেখেছিল। অবশেষে তিনি একদিন স্বপ্নাদেশে উপলব্ধি করলেন যে শুধু পুস্তকপাঠের মাধ্যমে আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া যাবে না, আধ্যাত্মিক অনুশীলনও প্রয়োজন, তখন তিনি "রামচন্দ্র মিশন" নামে সহজ রাজযোগ অনুশীলনের এক সংস্থায় দীক্ষা নেন ও নিয়মিত প্রার্থনা ও ধ্যান অনুশীলন করা শুরু করেন। তরুণ বয়সে যোগাসন, প্রাণায়াম, প্রার্থনা এবং ধ্যানের যে পর্ব শেষ হয়েছিল, সেখান থেকে শুরু হল আবার গভীর অনুশীলন। জীবনের রহস্য উন্মোচনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ঐকান্তিক নিষ্ঠাবান এবং কঠোর অধ্যবসায়ী সাধকে পরিণত করে। পরবর্তী কয়েক বৎসরে তিনি ধ্যানে শাস্ত্রে বর্ণিত সমস্ত অভিজ্ঞতাই ব্যক্তিগতভাবে অনুভব, দর্শন ও উপলব্ধি করেন-যেমন অনাহত নাদ শ্রবণ, সমাধি, দিব্যদর্শন (vision in trance) ইত্যাদি। কিন্ত এসব তার অন্তরকে তৃপ্তির বদলে আরও অশান্ত করে তুলতে থাকে-মুক্তির হাতছানি সত্ত্বেও তা যেন অধরাই থেকে যায়।
এই সময় নানা ঘটনাপরম্পরায় আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর সাথে যোগাযোগ হয় ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ইউ জী কৃষ্ণমূর্তির। ইউ জীর দর্শনে, স্পর্শনে, বাক্যবাণে আগুন লেগে যায় সব্যসাচীর অন্তরের গহনে সযত্নে লালিত সংস্কারের মধ্যে। ভেঙে যায় অহং-এর দুর্ভেদ্য বর্ম-কখনো হতাশ, কখনো হতবাক, কখনো চমকিত সব্যসাচীর মধ্যে মূলগত বৈপ্লবিক পরিবর্তন শুরু হয় এই সময়। ঊর্ধ্বচেতনার স্ফুরণ ঘটে তাঁর মধ্যে। এই চেতনার স্ফুরণ শুধু সূক্ষ্ম শরীরে বা প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, পরন্তু স্থুল পঞ্চভূতনির্মিত শরীরের মধ্যে স্ফুরিত হয়ে স্নায়ুজীববিজ্ঞানভিত্তিক রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে সাযুজ্য বা ছন্দোময় অবস্থানের প্রয়োজনে তার শরীরকে সম্পূর্ণভাবে রূপান্তরিত করে দেয়। সব্যসাচী তাঁর তখনকার মানসিক অবস্থা সন্বন্ধে দিনলিপিতে লিখেছেন-“আমার সমস্ত চিন্তাধারার মধ্যে আপাতত শুধু একটাই চাহিদা এবং এই চাহিদার দুরন্ত জীবনশক্তি অন্যান্য সমস্ত জাগ্রত চেতনার বিভিন্ন গতিমুখকে প্রবল পরাক্রমে দাবিয়ে রেখেছে। এই সর্বগ্রাসী চিন্তাটি হল–আমি নিজেকে এই পরিবেশের সান্নিধ্যে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত করে রাখতে চাই। আমার কাছে এ এক অভূতপূর্ব পরীক্ষামূলক যোজনা। এর নেশায় আমি বদ্ধ পাগল। এ অবস্থা জীবনে দু'বার আসে না। এরকম একটা পরিবেশের মধ্যে নিজেকে সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে অত্যন্ত গভীরভাবে অনুধাবন করতে চাই। কোনওরকম অতীত মানসিক প্রভাবের আওতায় না এসে অর্থাৎ এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরার জন্য ঘটনাবলী অনুধাবন করার যে সংস্কারজাত গভীর প্রবণতা আমাদের মধ্যে থাকে সে প্রবণতাকে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে উপেক্ষা করে এক লাগামছাড়া অবস্থার মধ্যে থেকে সদাজাগ্রত ইন্দ্রিয়গুলির সহযোগে এক তীব্র চেতনার আলো জ্বালিয়ে রেখে দেখতে চাই স্বচ্ছভাবে, আমাদের কোন গভীরে এক তপস্যাজাত তেজস্ক্রিয়তার সান্নিধ্য কি ধরনের আন্দোলন জাগাতে পারে। সে আন্দোলনের প্রভাব কোথায় এবং কেমনভাবে জীবনের গতিবিধির মধ্যে প্রস্ফুটিত হতে পারে।”
সব্যসাচীর জীবনে রূপান্তরের প্রক্রিয়ার তীব্রতা বিয়াল্লিশ দিন স্থায়ী হয়েছিল। এই সময় তিনি মৃত্যু এবং নবজীবনের স্বাদ বারংবার অনুভবের মাধ্যমে অলৌকিকভাবে একাকী জগৎ সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিলেন। এই সময় একবার নিরবচ্ছিন্নভাবে তিন দিন তিনি দেহবোধশুন্য, বাহ্যজ্ঞানরহিত হয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন ছিলেন। হিন্দুশান্ত্রে এরূপ অবস্থাকে “যোগনিদ্রা” হিসাবে বর্ণনা করা হয়। ওই সময় তার ঘরের কলিংবেল ক্রমাগত বাজতে থাকে। কলিংবেলের শব্দে ধীরে ধীরে সব্যসাচী নিদ্রিত অবস্থা থেকে জাগ্রত অবস্থায় ফিরে আসেন। মাতৃপ্রকৃতির কোনও অমোঘ অজানা কারণে যেন তিনি শরীররক্ষার প্রয়োজনে নিদ্রা থেকে উত্থিত হন। সব্যসাচী ক্ষুধার্ত দুর্বল শরীরে ঘরের দরজা খুলে দেখেন প্রতিবেশী এক ভদ্রমহিলা তাঁর জন্য সুস্বাদু খাদ্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন - তিনি ভক্তের অপ্রাপ্ত বস্তুর প্রাপ্তি এবং প্রাপ্ত বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণ করেন (যোগ ক্ষেম বহাম্যহম) । আর সব্যসাচী তাঁর দিনলিপিতে লিখলেন-“আমাদের জীবনে প্রকৃতিপ্রদত্ত শৃঙ্খলার পুনর্জন্ম ও পুনর্বিন্যাস ঘটলে যে মহান শক্তির উদ্ভব হয়, জীবনপ্রবাহের সমস্ত পাথেয় সেই শক্তি আপনা-আপনি সরবরাহ করে।” অপর একটি ঘটনা প্রসঙ্গে সব্যসাচী বলেন-“একদিন হঠাৎ দেখলাম আমি ক্লান্ত হয়ে চলতে চলতে একটা গাছের নিচে বসে পড়েছি। মাথার মধ্যে এক অস্বস্তিকর দহন, মাথায় হাত দিতেই মাথার চুল উঠে যেতে লাগল, ক্রমে সমস্ত মস্তকটাই চুলবিহীন হয়ে গেল-গাছের উপর থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘এ হল চৈতন্য মহাপ্রভুর মহাদশা’। এরপর মস্তকের ব্রহ্মতালু থেকে একটা আলোর স্তম্ভ আকাশের দিকে উঠে সমগ্র আকাশকে আলোকিত করে চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত হল-আমি বাহ্যজ্ঞানশুন্য হলাম।” এর উপর ছিল বিয়াল্লিশ দিনব্যাপী নানা শারীরিক বিপর্যয়ের ঘটনা। এক দিন রাত্রে পেটের নাভির চারিদিকে প্রচণ্ড উত্তাপ, সঙ্গে যন্ত্রণা। বাথরুমের বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলেন নাভির উপরে একটা অংশ সুপারির মতন ফুলে উঠেছে। একদিন মুখমণ্ডলে প্রচণ্ড উত্তাপের হলকা, মুখে উষ্ণ লালাস্রোত বইতে লাগল আর কপালের মাঝখানটা গোল হয়ে ফুলে উঠল। একদিন কম্পিউটারে বসে তন্ময় হয়ে কাজ করার সময় সব্যসাচী দেখলেন চোখের সামনে থেকে কম্পিউটারটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। আস্ত একটা কম্পিউটারের এহেন কোয়ান্টাম পার্টিকেলের ন্যায় অদ্ভুত আচরণে বিস্মিত সব্যসাচী যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তন্ময়তা কাটতে কম্পিউটারটিকে পুনরায় স্বস্থানে দেখে তিনি স্বস্তিলাভ করলেন। ক্রমাগত এই জাতীয় ঘটনার আকস্মিকতায় সব্যসাচী ভাবলেন তিনি বোধহয় পাগল হয়ে যাবেন। আর একদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে সব্যসাচী বলেন-“হঠাৎ রাত্রে ঘুম ভেঙে গেল শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে স্পন্দন এবং জ্বলনের কারণে। মনে হচ্ছিল প্রচণ্ড উত্তাপ শরীরের বিভিন্ন অংশের কোষগুলিকে দহন করে ভস্ম করে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ ওইভাবে থাকার পর ওই জ্বলন এবং স্পন্দন ক্রমে আপনা থেকেই কমে গেল। পরবর্তীকালে ভারতীয় বৈষ্ণব, শৈব, রামায়েৎ প্রভৃতি সাধক, সন্যাসীদের শরীরে ভস্ম এবং চন্দনের প্রলেপ, তিলক, ফোঁটা ইত্যাদি চিহিত স্থানগুলির ও হিন্দুশাস্ত্রে বর্ণিত বিভিন্ন চক্র বা গ্রন্থিগুলির অবস্থানের সঙ্গে নিজের শরীরের অভিজ্ঞতার, অনুভবের সাদৃশ্য বা মিল পেয়ে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম।” ওই সময় প্রায়শই তিনি লক্ষ্য করতেন যে তাঁর গলার সম্মুখভাগ গোলাকার ভাবে নীল হয়ে ফুলে উঠত। এখনও নির্দিষ্ট পারিপার্শ্বিকতায় এবং ঘটনাক্রমে তাঁর গলা নীল হয়ে ফুলে ওঠে। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে সব্যসাটী তাঁর নিজের শরীর দেখিয়ে বলেন-“সংস্কারমুক্ত এই শরীর নতুন বা পুরাতন কোনও সংস্কারকেই আর মেনে নিতে পারে না, তাই কোনও সংস্কার যদি এই শরীরে প্রবেশ করতে চায় শরীর প্রবলভাবে প্রতিরোধ করে সে প্রচেষ্টা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে। গলা নীল হয়ে ফুলে ওঠা ওই প্রবল প্রতিরোধেরই ইঙ্গিত।” ওই সময় সব্যসাচী ঘন ঘন সমাধিস্থ হতেন। একদিন সূর্যমুখী ফুলের দিকে তাকিয়ে তিনি সমাধিস্থ হয়ে পড়েন। কিছুদিন আগে উত্তরবঙ্গের চাপড়ামারি অরণ্যে গভীর বনানীর দিকে তাকিয়ে তিনি সমাধিস্থ হয়ে পড়েছিলেন (সঙ্গের বন্ধুরা সেই সমাধিস্থ অবস্থার ভিডিও রেকর্ডিং করে রেখেছেন)। অর্ধবাহ্য দশায় দিব্যদর্শনের (vision in trance) মাধ্যমে সব্যসাচী ভগবান বিনায়কের দর্শন পেয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপারটা অতীন্দ্রিয় বা অলৌকিক ঘটনা বলে মনে হলেও তার কাছে এই দর্শন বাস্তব এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ছিল। সব্যসাচী বলেন যে, এই জাতীয় দর্শনের অনুভব, অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার একমাত্র তাৎপর্য হল, সাধক বুঝতে পারেন যে তিনি সংস্কারমুক্ত হয়ে সঠিক পথে অগ্রসর হচ্ছেন এবং এই সময়ে শরীরে যে বিরাট মহৎশক্তির আবির্ভাব হয় তার কাছে জাগতিক কামনা-বাসনা-যশ, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, লোকমান্যতা একেবারেই নগণ্য ও তুচ্ছ বোধ হয়, এর বাইরে এর আর কোনও তাৎপর্য নেই। যদিও ধার্মিক তথা আধ্যাত্মিক ব্যাপারীরা এই সমস্ত দর্শন, অভিজ্ঞতাসমূহকে ফলাও করে প্রচারের মাধ্যমে আত্মশ্লাঘা বোধ করেন এবং খ্যাতি ও লোকমান্যতা বৃদ্ধির উদ্যোগ করেন। সব্যসাচীর শরীরে ঘটে চলা এই জাতীয় বিপর্যয়, আন্দোলন, দর্শন প্রভৃতি প্রসঙ্গে তিনি দিনলিপিতে লেখেন - “আমার দেহে যে সব আন্দোলন দেখা দিচ্ছে তা আমার ধারণার এতটা বহির্ভূত যে মনের জোরে এসব ঘটছে সে কথা আমি স্বীকার করতে পারছি না। এছাড়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস মনের জোর বা মনের সাহায্যে এসব শরীরে আবির্ভাব ঘটানো কোনওভাবেই সম্ভব নয়। যেমন কোনও মহিলা শুধু চিন্তাভাবনা বা মনের জোরে গর্ভবতী হতে পারবেন না-অনেকটা সেই রকম।”
৪২ দিন ধরে তাঁর শরীরে ঘটে চলা ঘটনাপ্রবাহের কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা বা ধারণা তার পশ্চাৎপটে ছিল না। অর্থাৎ এসবে তাঁর কোনও হাত ছিল না বা নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তিনি ছিলেন সমস্ত ব্যাপারগুলোর দ্রষ্টা বা সাক্ষী।
‘সতোরি’ বা স্বল্পকালীন সমাধির মাধ্যমে এখনো উচ্চ চেতনার (অতিমানস চেতনা) বিভিন্ন স্তর তাঁর মধ্যে উন্মোচিত হলেও এবং তা তাঁর জীবনকে প্রভাবিত করলেও স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে আর ব্যাহত করে না। মানবাত্মার মঙ্গলসাধনের জন্য উচ্চতর চেতনার এই প্রকাশ যা তাঁর শরীরকে অবলম্বন করে এবং ক্রমাগত রূপান্তরিত করে বিশ্বের বুকে প্রকাশিত ও উন্মোচিত হয়ে চলেছে তা মাতৃপ্রকৃতির এক কখনোই শেষ-না-হওয়া প্রক্রিয়া, কারণ সমাজ-সংস্কৃতি-সংস্কারের জগতে শক্তির নব নব বিন্যাসে চেতনার এই উর্ধ্বায়ন মানবাত্মার মঙ্গলের জন্য অবশ্যন্তাবী। যদিও সব্যসাচী চেতনার স্তরের অস্তিত্ব মানেন না। তার মতে স্বপ্ন না ভাঙলে যা যেরকম সেটি ঠিক সেইরকমভাবে দেখা অসম্ভব এবং তিনি সর্বদাই জ্ঞানালোকপ্রাপ্তি, নির্বাণ, মোক্ষ, প্রেম, সমাজ সংস্কারের মহানতা প্রভৃতি বিষয়কে পুরোপুরি অস্বীকার করে থাকেন। তাঁর মতে, আমাদের পশ্চাৎপট এবং সংস্কার আমাদের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির ছন্দময় অনুরণনের প্রতিবন্ধক। যদি ভাগ্যক্রমে অভিজ্ঞতার কাঠামো ভাঙতে শুরু করে তখন অনেক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়, কিন্তু এর কোনও তাৎপর্য নেই।
তাঁর জীবনের এই রূপান্তর প্রসঙ্গে সব্যসাচীর নিজের কথায়-“আমি আমার অন্তর্নিহিত শক্তির পঁচানব্বই শতাংশ ব্যয় করেছি গভীর আকাঙ্ক্ষা, নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে জীবনজিজ্ঞাসার উত্তরের খোজে আর পাঁচ শতাংশ ব্যয় করেছি পদার্থবিদ্যার অধ্যয়ন, অধ্যাপনা ও গবেষণার কাজে, এই হল আমার নিজের জীবনের কাহিনি আর বিশ্বপ্রকৃতির এ ব্যাপারে কী ভূমিকা বা কার্য সে রহস্যের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আমরা এখনো বিন্দু-বিসর্গ জানি না, আর আমাদের বস্তুভিত্তিক সুখভোগের চাহিদার সঙ্গে এর কোনও সম্বন্ধও নেই। অর্থাৎ আত্মতৃপ্তিজনিত সুখভোগের এবং তথাকথিত ধর্মগুরু বা ভণ্ড অধ্যাত্মবাদীদের আত্মশ্লাঘা ও ইন্দ্রিয় সুখভোগের বা বৈভবময় জীবনযাপনের চাতুরির সঙ্গে এই পরিবর্তন সম্পূর্ণ সংগতিহীন ও সম্পর্কহীন। তাই এই রূপান্তরকে সামাজিক লেনদেনের বাজারে উপভোগের সামগ্রী করে তোলা একেবারেই অসম্ভব।”
নব নব চেতনার উন্মেষ, ধারণাতীত বিষয়সমূহকে মানবের বোধগম্যতায় আনারই এক প্রকৃতিপ্রদত্ত প্রক্রিয়া যা তার মধ্য দিয়ে গত দেড় দশক ধরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। প্রকৃতিপ্রদত্ত মানবশরীর চিন্তারাজির নিরবচ্ছিন্ন কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হয়ে ভারহীন মুক্তজীবনের (যা তার স্বাভাবিক স্থিতি) অন্বেষণে যুগ যুগ ধরে যে ক্রন্দন করে চলেছে তার পরিসমাপ্তি ঘোষণার এবং প্রকৃতির সঙ্গে শরীরের ছন্দোময় সহাবস্থানের প্রয়োজনে যে আভ্যন্তরীণ চাহিদা তার প্রতিষ্ঠার জন্য ও মানবাত্মার পূর্ণ বিকাশের জন্য সব্যসাচীর জীবনে এর প্রকাশ যেন এক অন্তহীন পরিপূর্ণতালাভের যাত্রা। সমস্ত রকমের কাম্য ও কামনা পুরণের আকাঙ্ক্ষা বর্জন করে-জ্ঞানালোকপ্রাপ্তি, মোক্ষ বা সন্বোধীলাভের পথযাত্রীরা এই প্রচ্ছন্ন ঋষি সব্যসাচীর সংস্পর্শে এলে বুঝতে পারেন যে বাইরে থেকে কোনও আগুন দেখতে পাওয়া না গেলেও এই বাহ্যাড়ন্বরশূন্য শুদ্ধ মানুষটির সঙ্গ করলে এর প্রচণ্ড দাহিকাশক্তি কীভাবে তাদের পুড়িয়ে দেয়, সমস্ত আভ্যন্তরীণ সংস্কার দহন করে শুদ্ধ, বুদ্ধ, নিত্য, মুক্ত মানবে পরিণত করে। সব্যসাচী বলেন-মোক্ষ, মুক্তি, শুদ্ধ, বুদ্ধ-মানুষের এই সমস্ত ধারণাসমূহ মনোময় জগতের ব্যাপার, বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ধারণার বশবর্তী হয়ে থাকে ও থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের মুমুক্ষা শরীরের গভীর আভ্যন্তরীণ সংবেদন, সম্পূর্ণ শারীরিক চাহিদা। গভীরে এই চাহিদার অনুরণন হলে, সংবেদন জেগে উঠলে মানুষের অন্বেষণ শুরু হয়। এর জন্য প্রয়োজন সততা, নিষ্ঠা ও অসীম সাহসের। এর ফলে শরীরে সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব শক্তির ভারসাম্য-তখন, একমাত্র তখনই জীবনে প্রকৃতিপ্রদত্ত শৃঙ্খলার পুনর্জন্ম ও পুনর্বিন্যাস ঘটতে পারে।
প্রান্তরেখার দিক্চক্রবালে উদীয়মান সূর্যের আলোর ছটা যেমন তমসাকে ভেদ করে জগতের বুকে আলোর বন্যা বইয়ে দেয়, জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত সব্যসাচীর জ্ঞান ও প্রেমের আলো তেমনি বর্তমান বিশ্বের সমাজব্যবস্থায় সংস্কৃতি-সংস্কারের চাপে হতাশ, উদভ্রান্ত, দিশাহীন মানবাত্মার মধ্যে গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহের পর বর্ষার বারিধারায় ধরিত্রীর বুকে বয়ে আনা শীতলতার স্পর্শের মতন উন্নত চেতনাসমৃদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির আঙ্গিকে ভারহীন মুক্তমানবের চিন্তাধারা, যা মাতৃপ্রকৃতির দিব্য আশীর্বাদ স্বরূপ-সেটা এই সমস্ত জাগতিক মনাবাসনা মুক্ত, শুদ্ধ-সান্তিক, স্বল্পাহারী, সদাহাস্যময়, অলৌকিক প্রাণশক্তিতে ভরপুর, বর্তমানে স্বেচ্ছাবসরপ্রাপ্ত সব্যসাচীর সংস্পর্শে আসা মানুষেরা তাঁর জ্ঞানের ও প্রেমের স্পর্শে সর্বদাই অনুভব করছেন।